দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে হঠাৎ করেই নেমে আসে ঘন অমানিশা। সকাল আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটে বিমানটি মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ ফুট নিচে নেমে যায়, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফার উচ্চতার ছয় গুণেরও বেশি। প্রায় ১৮০ জন যাত্রী নিয়ে মাঝআকাশে ঘটা এই অস্বাভাবিক ও আশঙ্কাজনক পতনে মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ যাত্রীদের মনে জন্ম নেয় মৃত্যুর আতঙ্ক। শেষ পর্যন্ত একজন দন্তচিকিৎসক, কয়েকজন অফ-ডিউটি পাইলট এবং কয়েকজন সাহসী যাত্রীর বিচক্ষণতা ও অসম সাহসিকতায় এক ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় বিমানটি। পরবর্তীতে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবুক বিমানবন্দরে বিমানটিকে জরুরি অবতরণ করানো হয়।
ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে ইয়াসমিন আবুকাসিস নামের এক যাত্রী ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে জানান, বিমানে থাকা তাঁর মেয়ে মরিয়াম তাকে ফোন করে বলেছিলেন, বিমানের সবাই ভেবেছিল তারা আর বেঁচে মাটিতে ফিরতে পারবে না। মরিয়ামের বিবরণ অনুযায়ী, ককপিটে হুট করেই এক রক্তাক্ত তাণ্ডব শুরু হয়। এক পাইলট আরেক পাইলটকে ছুরি দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করছিল। ককপিটের ভেতর থেকে বাঁচাও, বাঁচাও আর্ত চিৎকার ভেসে আসছিল। এক নারী তার তিন সন্তানকে নিয়ে সামনের সারিতে বসা ছিলেন, তিনি ককপিটের কাছে গিয়ে চারদিকে প্রচুর রক্ত দেখতে পান।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় নিশ্চিত করেন যে, বিমানটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এক সাহসী যাত্রী ও একজন বিমানকর্মী ককপিটে ঢুকে পড়েন। তারা দুজন মিলে সেই হিংস্র পাইলটকে কাবু করেন, যিনি বিমানের পরিচালন ব্যবস্থা বিকল করার চেষ্টা করছিলেন। ইতোমধ্যে আরেকজন ক্রু সদস্য বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। অন্য একটি সূত্র জানায়, বিমানটির পেছনের সারিতে অফ-ডিউটি দুজন পাইলট বসা ছিলেন, যারা মূলত পরবর্তী একটি ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে যাত্রীরা চিৎকার করে তাদের ককপিটে গিয়ে বিমান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আকুতি জানান। শেষ পর্যন্ত সেই অন-ডিউটি ও অফ-ডিউটি পাইলটদের যৌথ প্রচেষ্টায় বিমানটি তাবুকের সুনির্দিষ্ট রানওয়েতে নিরাপদে অবতরণ করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা প্রায় এক মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় বিমানের ভেতর রক্তাক্ত চিত্র। ভিডিওতে এক যাত্রী আহত প্রধান পাইলটকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, আপনি আজ পুরো বিমানটিকে রক্ষা করেছেন। মাথা থেকে রক্ত ঝরতে থাকা অন্য এক পুরুষ হিব্রু ভাষায় বলছিলেন, ওরা এই বিমানে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, ওরা পাইলটকে খুন করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা তাকে পরাস্ত করেছি। অন্য এক কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, আমরা এখানে পাহারা দিচ্ছি, পাইলটের দরজার পাশ দিয়ে কাউকে যেতে দেওয়া হবে না। একই সাথে এক যাত্রী সেখানে থাকা হামলাকারী পাইলটকে নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে বলছিলেন, ওই লোকটিই আরেক পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেছে।
ককপিটের এই রক্তাক্ত হামলায় গুরুতর আহত হন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যাপ্টেন স্মিত মুচ্ছার। বিমানে থাকা এক দন্তচিকিৎসক যাত্রী এগিয়ে এসে রক্তে ভেসে যাওয়া আহত এই পাইলটকে প্রাথমিক ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রদান করেন। বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণের পর পরই আহত ক্যাপ্টেন ও ফার্স্ট অফিসারকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিমানের অন্যান্য ব্যাকুল যাত্রীদের টার্মিনালে প্রাথমিক সেবা দেওয়া হয়।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম 'ফ্লাইটরাডার২৪' নিশ্চিত করেছে, বিমানটি সীমান্ত অতিক্রম করার সময় প্রথমে একটি সাধারণ জরুরি বার্তা পাঠায়, এর পরপরই বেআইনি হস্তক্ষেপ বা ছিনতাইয়ের ইঙ্গিতবাহী সংকেত পাঠায় এবং পুনর্নির্ধারিত মুহূর্তে আবারও সাধারণ জরুরি সংকেত পাঠায়। সৌদি-জর্ডান সীমান্তের কাছাকাছি স্থানে দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিট উড্ডয়ন সম্পন্ন করার পর ফ্লাইটটি গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের দিকে ঘুরে যায়। এই ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ইসরায়েলি বিমানবাহিনী দ্রুত যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করে আকাশে পাঠালেও সৌদি আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই সেগুলোকে ফিরিয়ে আনা হয়।
সৌদি আরবের তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে তারা বিমানের একটি বার্তা পান এবং সাথে সাথে পুরো বিমানবন্দরে জরুরি অবস্থা জারি করেন। পরবর্তীতে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে বিমানটি সফলভাবে অবতরণ করে। বর্তমানে সৌদি কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার হওয়া ওই হামলাকারী পাইলটকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
ইসরায়েল সরকার ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। এটি কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা ইসরায়েলিদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গাভির জানান, একজন সন্ত্রাসী বিমানটিকে বিধ্বস্ত করে ভেতরের ইসরায়েলিদের হত্যা করতে চেয়েছিল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানান, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিমানে থাকা সমস্ত ইসরায়েলিদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আব্রাহাম চুক্তির অধীনে ২০২০ সালে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর ফ্লাইদুবাই প্রথম বিমান সংস্থা হিসেবে দুবাই ও তেল আবিবের মধ্যে বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু করেছিল।
সূত্র: এনডিটিভি

