শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদান, একাডেমিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশে বিশেষ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা পেয়েছেন পাবনার পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান হুসাইন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে সম্মাননা পদক, সনদপত্র ও দুই লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়।
জাতীয় পর্যায়ে পাবনার একজন শিক্ষক হিসেবে এমন মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি পাওয়ায় জেলার শিক্ষা অঙ্গনে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী মহল তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
শিক্ষকতায় বিশেষ অবদান
মো. ইমরান হুসাইন দীর্ঘদিন ধরে পাবনার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঠদানের পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষ করে তোলা এবং পাঠকে সহজ, সাবলীল ও সৃজনশীলভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষকতা জীবনে ইমরান হুসাইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা একাডেমিক সাফল্যের মধ্যে শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার প্রতিও তিনি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা, কঠিন বিষয় সহজভাবে বোঝানো এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরিতে তাঁর ভূমিকার কথাও জানিয়েছেন সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষায়
পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের নরজান গ্রামে ১৯৮৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মো. ইমরান হুসাইন। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তার পিতার নাম মোঃ সাদেক আলি,মাতা মাজেদা খাতুন।
চৌবারিয়া তোয়াজ উদ্দিন দাখিল মাদ্রাসায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে চৌকিবাড়ি মুস্তফাবিয়া দারুস সুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আতাইকুলা সড়াডাঙ্গী ফাজিল মডেল মাদ্রাসা থেকে আলিম এবং আরিফপুর জে ইউ এস ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ফাজিল ডিগ্রি অর্জন করেন।
এরপর পাবনা কামিল মাদ্রাসার হাদিস বিভাগ থেকে কামিল সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হন। প্রফেসর ড. হুসাইন আহমাদের তত্ত্বাবধানে তিনি এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক হিসেবে গবেষণা করছেন।
‘এই সম্মাননা দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে’
জাতীয় পর্যায়ের সম্মাননা পাওয়ার পর অনুভূতি প্রকাশ করে মো. ইমরান হুসাইন বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একজন শিক্ষক হিসেবে এমন স্বীকৃতি পাওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। তবে এই সম্মাননা তাঁর দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি সবসময় চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের আদর্শ, নৈতিক ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পাওয়া এই সম্মাননা ভবিষ্যতে আরও নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেশ ও জাতির সেবায় কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।”
নিজের এই অর্জনের পেছনে সহধর্মনী, বাবা-মায়ের দোয়া, আত্মীয়স্বজন, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের অনুপ্রেরণা এবং সহকর্মীদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি আরও বলেন, “আজকের এই আনন্দের দিনে আমার আব্বাজান বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আমি তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।”
বর্তমানে আমার দুইছেলে ও একটা মেয়ে আছে আমি আপনাদের কাছে দোয়া চায় আল্লাহপাক যেন ওদের দেশ সেরা নয় বিশ্ব সেরা হিসাবে কবুল করেন।
গর্বিত পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসা
ইমরান হুসাইনের এই অর্জনে গর্বিত পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান হুসাইনের জাতীয় পর্যায়ের এই অর্জন আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গর্বের। তাঁর এই স্বীকৃতি পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসার দীর্ঘ শিক্ষাগত ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর সাফল্যে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই স্বীকৃতি ইমরান হুসাইনকে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
একই দিনে পাবনার আরও দুই শিক্ষক সম্মানিত
জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক’ সম্মাননায় পাবনার আরও দুই শিক্ষকও নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন—পাবনা মির্জাপুর দাখিল মাদ্রাসার সহকারী জীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. ইকরামুল হক এবং ঈশ্বরদী ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী মো. মিনারুল ইসলাম।
একই জেলার তিন শিক্ষকের জাতীয় পর্যায়ে এমন মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি পাওয়ায় পাবনার শিক্ষা অঙ্গনে তৈরি হয়েছে আনন্দ ও উৎসবের আবহ।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে পাবনার তিন শিক্ষকের এই স্বীকৃতি জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। তাঁদের এই অর্জন নতুন প্রজন্মের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আরও নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।

