সুপ্রভাত ঢাকা

যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা, সহিংসতা কমেছে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা, সহিংসতা কমেছে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা, সহিংসতা কমেছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর স্থিতিশীলতা এসেছে এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা আগের তুলনায় কমেছে বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস)। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করা, মতপ্রকাশ এবং জনআলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।

যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম (সিপিআইটি) প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অব আ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশ: পলিটিক্যাল সিচুয়েশন, অক্টোবর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার বিষয়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তৈরির অংশ হিসেবে সিপিআইটির তিন কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময় তাঁরা সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রতিবেদনের নির্বাহী সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় স্থিতিশীল হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে উন্নতি করেছে। তবে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহি ও কার্যকারিতা এবং ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উদ্বেগ এখনো রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা কমেছে

প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম সহিংস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে রাজনৈতিক সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে সংঘটিত অনেক ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। এসব ঘটনার পেছনে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ ও সংঘাতের ঝুঁকি রয়ে গেছে।

বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুযোগ বৃদ্ধি

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য রাজনৈতিক দল সরকারকে সমালোচনা, রাজনৈতিক প্রচার, সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ আয়োজনের সুযোগ পাচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে দলগুলোর কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং জনপরিসরে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে। সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীরাও তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দলটির সমর্থকদের পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দলটির প্রকাশ্য সমর্থকরা সামাজিক বিরূপতা, হয়রানি কিংবা সহিংসতার মুখে পড়তে পারেন। ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ার সামগ্রিক চিত্রের পাশাপাশি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ঘিরে উদ্বেগও রয়েছে।

২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের তথ্য

প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছেন এবং এ ধরনের অধিকাংশ মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক মামলাগুলোর পর্যালোচনা এখনো চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত কথিত অপরাধের অভিযোগে দলটির অনেক নেতা, কর্মী ও সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সাধারণ আদালতে বিচারাধীন। কারও কারও জামিন হয়েছে, আবার অনেকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক রয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের বক্তব্য

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদলকে জানান, বিভিন্ন আর্থসামাজিক সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোতে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিও তাঁরা তুলে ধরেন।

তবে প্রতিবেদনে পুলিশের জবাবদিহি, কার্যকারিতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও রয়েছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতির প্রয়োজন রয়েছে।

সংস্কার বাস্তবায়নে এখনো চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, জুলাই-পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রস্তাবিত ব্যাপক সংস্কারের বাস্তবায়ন এখনো সীমিত।

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সময় তুলনামূলকভাবে কম অতিবাহিত হওয়ায় সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে সতর্ক থাকার কথাও বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস, বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুযোগ বৃদ্ধি এবং ২১ হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহারের তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংঘাত, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ঘিরে হয়রানির আশঙ্কা, পুলিশের জবাবদিহি এবং সংস্কার বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। এতে উত্থাপিত তথ্যগুলোকে সব ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য সরকারের নিজস্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণের সংকলন হিসেবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনটি মূলত যুক্তরাজ্যের অভিবাসন, আশ্রয় ও মানবাধিকারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তার জন্যও ব্যবহৃত হয়।