সুপ্রভাত ঢাকা

উপকূলের ভাঙন আর লোনাপানির চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে কয়রায় তারুণ্যের নতুন স্বপ্ন

উপকূলের ভাঙন আর লোনাপানির চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে কয়রায় তারুণ্যের নতুন স্বপ্ন
উপকূলের ভাঙন আর লোনাপানির চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে কয়রায় তারুণ্যের নতুন স্বপ্ন

‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জনপদ কয়রায় পালিত হয়েছে জাতীয় যুব দিবস। তবে জাতীয় এই দিবসের রঙিন আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও এখানকার যুবসমাজ এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। নদীভাঙন, কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা কয়রার তরুণরা আজ প্রথাগত চাকরির পেছনে না ছুটে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার নতুন স্বপ্ন দেখছেন।

রোববার (১ নভেম্বর) সকাল ১০টায় কয়রা উপজেলা প্রশাসন ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়। দিবসটি উপলক্ষে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি র‌্যালি বের করা হয়।

র‍্যালিটি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল বাকীর সভাপতিত্বে এবং সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আকরাম হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা কে এম মফিজুর রহমান। আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল জাবির, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রেশমা আক্তার এবং কয়রা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. শরিফুল আলম।

প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই: থেমে নেই কয়রার তরুণরা

কয়রা উপজেলার মহারাজপুর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, আমাদি ও কয়রা সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এখানকার যুবসমাজ নানামুখী সংকটের মধ্যেও নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় তরুণরা ঝুঁকছেন ছোটখাটো ব্যবসা, আধুনিক কৃষি, মৎস্য চাষ এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের দিকে।

উপজেলার গোবরা ও ঘুগরাকাটি এলাকার যুবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এখানকার জীবনযাত্রা অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে আলাদা। প্রতি বছর বেড়িবাঁধ ভাঙন এবং লোনাপানির আগ্রাসনে ফসলি জমি নষ্ট হওয়ায় যুবসমাজ নতুন পেশার সন্ধানে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে আবার জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী বা মৌসুমী ধান কাটার শ্রমিক কেউ ভাটার শ্রমিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাড়ি জমাচ্ছেন।

সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণের দাবিঃ

স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারা বলছেন, কয়রায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন এবং মৎস্য সেক্টরে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হলে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও কারিগরি সহায়তার পরিধি বাড়াতে হবে।

কয়রা সদর বাজারের তরুণ উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ‘আমাদের এখানে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পুঁজির অভাবে বড় কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না। যুব দিবসে সরকারের পক্ষ থেকে বড় বড় প্রতিপাদ্য শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে যুবকদের আর্থিক প্রণোদনা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা দরকার।’

এক নজরে কয়রা উপজেলার যুবসমাজের বর্তমান চিত্র

সূচক বর্তমান পরিস্থিতি

১) প্রধান চ্যালেঞ্জঃ নদীভাঙন, কর্মসংস্থানের সংকট ও সীমিত আয়ের সুযোগ।

২)তারুণ্যের নতুন ঝোঁকঃ আধুনিক মৎস্য খামার, পোলট্রি, ছোট ব্যবসা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার।

৩) মূল দাবিঃ সহজ শর্তে যুব ঋণ বিতরণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সুযোগ বৃদ্ধি।

আলোচনা সভা শেষে যুব দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক-যুবতীদের মাঝে সনদপত্র, গাছের চারা এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সহজ শর্তে যুব ঋণের চেক বিতরণ করা হয়।

কয়রা উপজেলার তরুণরা শুধু সুবিধাভোগী হতে চায় না, তারা চায় সুযোগ। সুন্দরবনের সুরক্ষায় এবং উপকূলীয় এই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কয়রার যুবসমাজকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের চিত্র। আজকের যুব দিবসে উপকূলের এই তরুণদের চোখে একটাই স্বপ্ন—দারিদ্র মুক্ত টেকসই জীবন এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান।