সুপ্রভাত ঢাকা

১১ বছরেও দমানো যায়নি হুতিদের, এখন কী করবে সৌদি আরব?

১১ বছরেও দমানো যায়নি হুতিদের, এখন কী করবে সৌদি আরব?
১১ বছরেও দমানো যায়নি হুতিদের, এখন কী করবে সৌদি আরব?

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার পর পাল্টা পদক্ষেপের চাপে পড়েছে রিয়াদ।

এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই হামলার পর কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে দেশটি, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। তবে স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা চাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহযোগিতায় বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করা- প্রতিটি পথেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি।

গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিদ্রোহীরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। উল্টো সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করেছে তারা। শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের অনুসৃত কৌশল থেকে শিক্ষা নিয়ে হুতিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য শুধু সৌদি আরবকে সামরিকভাবে চাপে ফেলা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়া।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে রিয়াদের এক দশকব্যাপী যুদ্ধ ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। তবে সাম্প্রতিক হামলাকে অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে দেখছেন।

স্থলযুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি

গত ১১ বছর ধরে সামরিক অভিযান ও আলোচনার মাধ্যমে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। কিন্তু তাতে বিদ্রোহীদের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। বরং তারা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ তাইজের মতো এলাকাও দখলের চেষ্টা করছে।

সৌদি রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক আলী শিহাবি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, “এই হুমকির স্থায়ী সমাধান করতে হবে।”

তার মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। সৌদি আরব আকাশপথে তাদের ব্যাপক সহায়তা দিচ্ছে।

এখন পর্যন্ত সৌদি আরব মূলত হুতিবিরোধী ইয়েমেনি জোটকে বিমান সহায়তা দিয়ে আসছে। নিজস্ব বিপুলসংখ্যক সেনা সরাসরি স্থলযুদ্ধে পাঠানো থেকে বিরত রয়েছে দেশটি। তবে রিয়াদে সর্বশেষ হামলার পর এই সংযম বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইয়েমেনে বড় আকারে সৌদি সেনা মোতায়েন করলে দুর্গম ভূখণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে দেশটি। একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের গড়ে তোলা স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়েছে হুতিরা

প্রায় দুই দশক আগেও হুতিরা ছিল ছোট একটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন। ইরানের সমর্থনে সময়ের সঙ্গে তারা শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এখন তাদের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো দিয়ে তেল আবিবের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যেও হামলা চালানো সম্ভব।

বছরের পর বছর হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, বিদ্রোহীরা তাদের যুদ্ধকৌশল উন্নত করেছে। তাদের হামলা আরও অত্যাধুনিক ও ধারাবাহিক হয়েছে, পাশাপাশি গোয়েন্দা সক্ষমতাও বেড়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলির অভিযোগ, হুতিরা ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়িয়েছে। তার দাবি, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও দ্রুতগতির এবং তাপ শনাক্তকারী ব্যবস্থার সাহায্যে তাপের উৎস অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা অবশ্য নিশ্চিত নয়।

হুতিদের অস্ত্র উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে অবস্থিত একটি গোষ্ঠী তাদের ক্লড এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে। এসব সফটওয়্যার উড্ডয়নের সময় অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবেদনটিতে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে এলাকাটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে রিয়াদ

হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব বিভিন্ন দেশের সমর্থন চেয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো অন্য মিত্ররাও সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সিরিয়ার সহায়তাও চেয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধের পর দেশটি থেকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

তবে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলায় অংশ নেয়নি। এর পরিবর্তে নতুন গঠিত যৌথ কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা সহায়তা দিতে ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন।

গত বছর ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি মার্কিন জাহাজ চলাচলের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়। গত মাসে সৌদি যুবরাজ দু’বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে সে সময় সিএনএনকে জানিয়েছিল কয়েকটি সূত্র। তবে ট্রাম্প তাতে সম্মত হননি।

আলী শিহাবির মতে, মার্কিন বিমানবাহিনী সরাসরি অংশ নিলে সৌদি আরবের সুবিধা হতো। কারণ, মার্কিন বিমান দ্রুত স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে পারে। সৌদি বিমানবাহিনীকে সেই প্রক্রিয়ায় একটি অতিরিক্ত ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

মার্কিন নাগরিক নিহত, ট্রাম্পের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনলেও সৌদি আরব এখনও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশাল মরুভূমিজুড়ে বিস্তৃত দেশটির জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তুলনামূলক কম খরচে তৈরি হুতিদের একমুখী ড্রোনের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ রবিবার জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। এই ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনকে সংঘাতে আরও সরাসরি যুক্ত হওয়ার চাপের মুখে ফেলতে পারে।

হামলার পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “সৌদিরা ভালো যোদ্ধা। তবে আমার মনে হয়, হামলাটি ছিল ভয়াবহ।”

যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় যোগ দেবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা যোগ দিতে পারি।”

ট্রাম্পের এই মন্তব্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে সৌদি আরবের সামনে এখনও বড় প্রশ্ন- দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধের ঝুঁকি নেবে, নাকি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে হুতিদের মোকাবিলা করবে। সূত্র: সিএনএন