সকালের আলো তখনো পুরোপুরি তেজি হয়ে ওঠেনি। গ্রামের ইট বিছানো সরু পথের এক পাশে বাড়িঘর, অন্য পাশে গাছপালা আর খাল। পথের ধারে বসে আপন মনে পাটি বুনছিলেন এক নারী। সামনে মেলে রাখা খেজুরপাতার সরু ফালি। দুই হাতে নিপুণভাবে একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে তৈরি করছেন পাটি। দৃশ্যটি যেন কয়েক দশক আগের কোনো গ্রামের ছবি। অথচ সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনও। প্লাস্টিক, নাইলন ও আধুনিক নানা পণ্যের ভিড়ে খেজুরপাতার পাটির ব্যবহার এখন অনেকটাই কমে গেছে।
খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের সুফিয়া খাতুন (৬০) প্রায় ৩০ বছর ধরে খেজুরপাতার পাটি বুনছেন। দাদি-শাশুড়ি ও শাশুড়ির কাছ থেকে হাতে-কলমে এ কাজ শিখেছেন তিনি। একসময় পরিবারের নারীরা সবাই মিলে পাটি বুনতেন। শাশুড়ি, ননদ, জা—সবাই একসঙ্গে বসে দুই-তিন দিনে একটি পাটি তৈরি করে ফেলতেন। চাঁদনি রাতে উঠানে বসে চলত পাটি বোনার পাশাপাশি গল্প-আড্ডা। এমনকি কে আগে পাটি শেষ করতে পারেন, তা নিয়েও চলত একধরনের আনন্দের প্রতিযোগিতা।
সেই দিন এখন নেই। সুফিয়া বলেন, “আগে দাদি শাশুড়ি, শাশুড়ি, ননদ, জা—সবাই মিলে পাটি বুনতাম। দুই-তিন দিনে একটা পাটি বুইনা ফেলতাম। এখন তো একাই বুনি। ছেলের বউরা এসব বোনে না, শেখেও না। সংসারের কামের ফাঁকে বুনতে হয়, তাই একটা পাটি বানাইতে ৮ থেকে ১০ দিন লাগে।”
একসময় খেজুরপাতার পাটি ছিল গ্রামের ঘরের অপরিহার্য সামগ্রী। ঘুমানো, মেহমান বসানো, নামাজ পড়া, উঠানে বসা, ধান শুকানো এমনকি কুমড়োর বড়ি দেওয়ার কাজেও ব্যবহার হতো পাটি। গরমের দিনে পাটিতে ঘুমালে শরীরে আরাম লাগত, ঠান্ডা অনুভূত হতো। এখন সেই ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে ধান শুকানোর কাজেই পাটির ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
শ্রীরামপুরে এখনো আনোয়ারা, মোমেনা, মাজেদা, আমেনাসহ প্রায় ১০টি পরিবার পাটি বোনে। মহারাজপুরের আরও কয়েকটি পরিবারেও এ কাজ টিকে আছে। তাঁদের মধ্যে মজিদা খাতুনের কাছে প্রায়ই পাটির অর্ডার আসে। তবে তিনিও মনে করেন, নতুন প্রজন্ম আগ্রহী না হলে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
মজিদা খাতুন বলেন, “আস্তে আস্তে নতুন প্রজন্ম আসলে এগুলো বন্ধ হইয়া যাবে। আমি যখন থাকব না, তখন পাতার পাটির ঐতিহ্যও হয়তো থাকবে না।”
কার্তিকেই শুরু হয় পাতার প্রস্তুতি
পাটি তৈরির প্রধান উপকরণ খেজুরপাতা। কার্তিক মাসে খেজুরগাছিরা রস সংগ্রহের জন্য গাছ পরিষ্কার ও ডালপালা কাটার সময় নারীরা পাতা সংগ্রহ করেন। আগে এসব পাতা অনেক সময় বিনা টাকায় পাওয়া গেলেও এখন কিনে নিতে হয়। একটি গাছের পাতা সংগ্রহে প্রায় ৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয় বলে জানান তাঁরা।
ডাল থেকে পাতা ছাড়িয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন রোদে ভালোভাবে শুকানো হয়। এরপর ছোট ছোট আঁটি বেঁধে বস্তায় সংরক্ষণ করা হয়। সারা বছর সেই শুকনো পাতা দিয়েই প্রয়োজন ও অর্ডার অনুযায়ী পাটি তৈরি করেন কারিগররা।
খেজুরপাতার পাটিরও রয়েছে নানা ধরন—সাদা পাটি, ডোরাকাটা, রঙিন, নকশি, আসন ও নামাজের পাটি। এছাড়া কুলি জো ও কুলোর জো পাটি ধান শুকানোর কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। ধরন ও আকারভেদে এসব পাটির দাম সাধারণত ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে শ্রম দেওয়ার পরও আয় খুব বেশি নয়। পাটি বুনে বছরে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মতো বাড়তি আয় হয় বলে জানান কয়েকজন নারী। সুফিয়া বলেন, “এই কাম কইরা বছরে ১০-১৫ হাজার টাকার মতো সংসারে সহযোগিতা করতে পারি। বেশি না, তয় নিজের হাতে কাম কইরা কিছু টাকা পাই—এইডাও ভালো লাগে।”
পলিথিন-ত্রিপলের কাছে হারছে পাটি
পাটির চাহিদা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে পলিথিন, প্লাস্টিকের মাদুর ও ত্রিপলের ব্যবহারকে দায়ী করছেন গ্রামের নারীরা। এসব পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় এবং সহজে গুটিয়ে রাখা যায়। অন্যদিকে পাটি তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। সংরক্ষণ করে রাখলেও ইঁদুরে কেটে নষ্ট করার আশঙ্কা থাকে।
সুফিয়া বলেন, “আগে পলিথিনের ব্যবহার কম আছিল। এখন পলিথিন আর ত্রিপল কম দামে পাওয়া যায়। পাটির দাম বেশি, আবার বুইনা উঠাইয়া রাখতে হয়। তাতে ইঁদুরে কাইটা দেয়। তাই মানুষ আর আগের মতো পাটি কিনতে চায় না।”
মা-চাচির কাছ থেকেই শেখা
পাটি বোনার দক্ষতা একসময় পরিবারেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ত। মা মেয়েকে, শাশুড়ি পুত্রবধূকে শেখাতেন। চাচি, জা ও ননদের কাছ থেকেও শেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা এখন ভেঙে যাচ্ছে।
সুফিয়ার ভাষায়, “আমার শাশুড়ি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ শেখাইছে। আমরা শিখছি। মা-চাচিরাও শেখাইত। কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়ে, বউ-ঝিরা এই কাম করতে চায় না। এত সময় ধইরা বইস্যা বোনার সময় কই?”
তিনি জানান, আগে চাঁদনি রাতে উঠানে কয়েকজন নারী একসঙ্গে বসে পাটি বুনতেন। কাজের ফাঁকে গল্প-আড্ডাও চলত। এখন সময় পেলেই অনেকেই মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
হারিয়ে যাচ্ছে একটি গ্রামীণ ঐতিহ্য
মহারাজপুরের ভদি খাতুন বলেন, “ছোটবেলা থেইক্যাই মায়ের কাছে বইস্যা পাটি বুনতে শিখছি। আগে তো প্রায় ঘরেই পাটি বোনা হইত। এহন আর আগের মতো মানুষ পাটি বানায় না।”
পাটি বোনা শুধু একটি ঘরোয়া কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ নারীদের দক্ষতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, অবসর বিনোদন ও বাড়তি আয়ের সুযোগ। একসময় বিকেল হলেই কয়েকজন নারী এক জায়গায় বসে পাটি বুনতেন। এখন সেই সম্মিলিত দৃশ্যও প্রায় হারিয়ে গেছে।
স্থানীয় নারীরা মনে করেন, খেজুরপাতার পাটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই একটি পণ্য। স্থানীয়ভাবে এর ব্যবহার ও বাজার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে গ্রামীণ নারীদের জন্য তৈরি হতে পারে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
ইট বিছানো গ্রামের সেই পথের পাশে এখনো সুফিয়া, মজিদা ও আরও কয়েকজন নারীর হাত চলে। একের পর এক খেজুরপাতা জুড়ে তৈরি হয় পাটি। এক সপ্তাহ কিংবা ১০ দিনের শ্রমে তৈরি সেই পাটির দাম হয়তো কয়েকশ টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতের কাজ, নারীদের স্মৃতি, সংসারের গল্প আর গ্রামীণ জীবনের এক হারিয়ে যেতে বসা অধ্যায়।

