সুপ্রভাত ঢাকা

নির্যাতিত নারীর পাশে ‘সাজু আপা’

নির্যাতিত নারীর পাশে ‘সাজু আপা’
নির্যাতিত নারীর পাশে ‘সাজু আপা’

নির্যাতিত নারী ও শিশুর খবর পেলেই ছুটে যান তিনি। কখনো থানায়, কখনো হাসপাতালে, আবার কখনো নির্যাতিত পরিবারের দরজায়। অসহায় নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আইনি সহায়তার পথ দেখানো, মানসিক সাহস জোগানো কিংবা ন্যায়বিচারের জন্য সহযোগিতা করাই যেন তার নিত্যদিনের কাজ। এলাকায় সবাই তাকে চেনেন ‘সাজু আপা’ বা ‘মানবাধিকার সাজু’ নামে।

তিনি সাজেদা পারভীন সাজু। বয়স ৪৭ বছর। বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা হিমছড়ি এলাকায় দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি মৃত হাজী মোস্তাক আহমেদ ও মৃত রাবেয়া খাতুনের মেয়ে।

নিজের জীবনেই বাল্যবিবাহ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হয়েছে সাজুর। ১৯৯১ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। তখন তিনি চকরিয়ার দিগরপানখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সংসারের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে গিয়ে ১৯৯৬ সালে এসএসসি পাস করেন।

২০১০ সাল পর্যন্ত সংসার জীবন মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু ২০১১ সালে স্বামীর পরকীয়া, অবহেলা এবং শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কারণে সেই সংসার ভেঙে যায়। স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে বাবার বাড়ি ইয়াংছা হিমছড়িতে ফিরে আসেন তিনি।

সেই সময়ের অভিজ্ঞতাই বদলে দেয় সাজুর জীবন। তিনি উপলব্ধি করেন, একজন নির্যাতিত নারীর জন্য সমাজে টিকে থাকা কতটা কঠিন। তখনই সিদ্ধান্ত নেন—তার মতো আর কোনো নারী কিংবা শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তিনি তাদের পাশে দাঁড়াবেন।

এরপর সংসারের ব্যস্ততার মধ্যেও নির্যাতিত নারী ও শিশুদের জন্য কাজ শুরু করেন সাজেদা পারভীন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হন। তার দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তিনি ৫৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সরাসরি কাজ করেছেন। এর মধ্যে তিনটি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের শিকার ৩০ নারীকে সংসারে ফিরিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছেন। আরও ২০টি মামলা বিভিন্ন আদালতে চলমান রয়েছে।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনাতেও নির্যাতিত এক তরুণীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। গত ১২ সেপ্টেম্বর ইয়াংছা এলাকার এক তরুণীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লামা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণঝিরি এলাকার এক যুবক প্রায় ছয় মাস বিভিন্ন স্থানে রেখে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ওই যুবক ও তার পরিবার বিয়েতে অনীহা প্রকাশ করলে সাজু ওই তরুণী ও তার অভিভাবকদের নিয়ে প্রথমে যুবকের বাড়িতে যান। সেখানে সমাধান না হওয়ায় পরে লামা থানায় আইনি সহায়তা চেয়ে অভিযোগ করেন।

সাজেদা পারভীন সাজু বলেন, “নির্যাতিত একজন নারী তখন সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। তার পাশে দাঁড়িয়ে মানসিক শক্তি দেওয়া আমার কাজ। আপোষযোগ্য বিষয় হলে ন্যায্য সমাধানের চেষ্টা করি। আর গুরুতর ঘটনা হলে আইনি সহায়তা কোথায় ও কীভাবে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিই। প্রয়োজন হলে ভিকটিমের সঙ্গে হাসপাতাল ও থানাতেও যাই।”

তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ২০১৩ সালে ছয় বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার ধর্ষণ, ২০১৪ সালে হাইদারনাশী এলাকায় স্বামী কর্তৃক পারভীন আক্তারকে নির্যাতন, ২০১৬ সালে বনপুর এলাকায় সালমা আক্তার ধর্ষণ, ২০১৮ সালে জাহেদা বেগম ধর্ষণ এবং ২০২৫ সালে মহিমা আক্তার ধর্ষণের ঘটনা। এসব মামলার কয়েকটি এখনও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে কাজ করতে গিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয় সাজুকে। তার মতে, সরকারি হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও থানার নারী ও শিশু সেবা সেল আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন। ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচেরও প্রয়োজন হয়। দরিদ্র ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে এসব ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় নিজের অর্থেই সহযোগিতা করতে হয় বলে জানান তিনি।

সাজেদা পারভীন মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে না। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, মানসিকতার পরিবর্তন, দ্রুত বিচার, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় জেন্ডার সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

নিজে বাল্যবিবাহ ও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েও সেই অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করেছেন সাজেদা পারভীন সাজু। এখন তার প্রত্যাশা—নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ একটি সমাজ। যেখানে নির্যাতনের শিকার কাউকে নীরবে কষ্ট সহ্য করতে হবে না, বরং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ থাকবে। “পৃথিবীটা হোক সব মানুষের”—এই প্রত্যাশাতেই নির্যাতিতদের পাশে ছুটে চলেছেন ‘সাজু আপা’।